গীতবিতান-GITABITAN
স্বপন যদি ভাঙিলে রজনীপ্রভাতে

Monogram

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩০৯ (১৯০৩)
কবির বয়স: ৪১
প্রকাশ: ১৯০৩ , কাব্যগ্রন্থ ৮ (ব্রহ্ম)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-জাগরণ; ২৭৬/১১৮
রাগ / তাল: রামকেলি / একতাল
স্বরলিপি: আনুষ্ঠানিক স্বরলিপি গ্রন্থ - ২; স্বরবিতান ৬৩
স্বরলিপিকার: ভি. ভি. ওয়াঝলওয়ার; ঐ
পাদটিকা:
হিন্দি-ভাঙা গান (খেয়াল), 'কাহে না তুম জাবত', মূল গীতি/সুরকার- অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দিরা দেবী প্রাপ্তিস্থান লেখেননি [ র-ত্রি ]; [ র-ভা ]। বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ওয়াঝেলওয়ারের করা স্বরলিপির (রাধিকা গোস্বামীর রেকর্ড-অনুসারে করা) পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। পরে ইন্দিরা দেবীও স্বরলিপি করেছেন।  
১৩০৯ কোলকাতায় আদি ব্রাহ্ম সমাজের মাঘোৎসবে গীত।  

আলোচনা

আদর্শ গান:

    রামকেলি/ একতাল (মধ্যলয়)

  কাহে না তুম জাওয়ত যমুনা তটমে
    রঙ্গ করত মন সুন্দর মোহন।
      বংশী লেকে চলো অব
      চাহে তুয়া দরশন॥

    --অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়  
     --গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস  



একবার মনে আছে খুব বড় গায়ক রাধিকা গোস্বামীকে দেখেছিলাম রবীন্দ্রনাথদের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। গাইছেন রবীন্দ্রনাথের সামনে নসে। সে অবশ্য বহুদিনের কথা। আমার বয়স তখন অল্পই। রাধিকাবাবুকে দেখে মনে হল তাঁর বয়স হয়েছে। তাঁর মুখে সেদিন রামকেলি রাগে রচিত রবীন্দ্রনাথের 'স্বপন যদি ভাঙিল' [যল্লিখিতং] গানটি শোনবার সৌভাগ্য লাভ করি। এখনও কানে বাজে-- 'স্বপন'-র 'ন'-এর উপর তাঁর সেই অপূর্ব দানা বাঁধা গিট্‌কিরীর কাজ, আর মনে পড়ে 'ভাঙিল'-এর 'ভা'-র উপর মীড়ের ঠিক আগেই ঝোঁকটি ফেলার কায়দার কথা। এই গানটি কারো মুখে শুনলেই রাধিকাবাবুর কণ্ঠে শোনা গানটির সেই সব স্মৃতি ভেসে ওঠে। কি সব উদাত্ত পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠস্বরই ছিল তখন। (১৪৮)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  


স্বতন্ত্রভাবে অভিনয় ও গানের প্রাধান্য ছিল অত্যধিক, শান্তিনিকেতনের শিক্ষার পরিবেশে। জগদানন্দ রায় [শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগের খ্যাতনামা শিক্ষক] জানাচ্ছেন: "বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে দুই-তিন বৎসর ১লা বৈশাখে যে উৎসব হইত, তাহার কথা আজও ভুলি নাই। বেশ মনে পড়ে লাইব্রেরির বড় ঘরটিতে সকলে বসিয়া গল্প করিতেছিলেন এবং পাশের ঘরে জলযোগের আয়োজন চলিতেছিল। গুরুদেব '   আমারে করো তোমার বীণা ' গানটি গাহিলেন। ... তারপর যখন রাত্রি চারিটার সময় মন্দির হইতে মৃদঙ্গের শব্দ এবং রাধিকা গোস্বামী মহাশয়ের প্রভাতী রাগিণীর সুর [বহু আলোচিত রেকর্ড-- '   স্বপন যদি ভাঙিলে '] কানে আসিত, তখন মন্দিরে গিয়া উপস্থিত হইতাম। (৮৭)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, জীবনের ধ্রুবতারা, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৬  


"স্বপন যদি ভাঙিলে" গানটিতে শুধু যে রাগরূপের সহজ আবেদন ফুটে উঠেছে তাই নয়, শুদ্ধ আলাপচারির যে ঢঙ ধ্রুপদাঙ্গ বলে চিহ্নিত হতে পারে রবীন্দ্রনাথ তাকেই আশ্রয় করেছেন। মীড়-প্রধান এই গানটির গায়নরীতিতে অতি-বিলম্বিত লয়ের বাঁধুনি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভৈরোঁ রাগে ব্যবহৃত কোমল ঋষভ কোমল ধৈবত-এর শ্রুতিতে যে বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ এবং কোমল ধৈবতের আন্দোলনে যে অসাধারণ বৈভব তা দ্রুত লয় বা মধ্য লয়েও ঠিক পরিস্ফুট হয় না। (১০৭)  
     --অরুণ ভট্টাচার্য, "রবীন্দ্রসংগীতে রাগমিশ্রণের ইতিহাস", রবীন্দ্রসংগীতায়ন - ১, প্যাপিরাস, ১৯৮২  


এই গানটিতে রামকেলি রাগের বিশেষত্ব, যা অবরোহণের সময় কড়ি মধ্যম ছুঁয়ে একটু উঠে স্বাভাবিক মধ্যমে গিয়ে নেমে আসে, তা একেবারেই অনুপস্থিত স্বরলিপিতে। যদিও আমরা আগেই স্বীকার করে নিয়েছি যে তর্কের অবকাশ থাকলেও রাগের ব্যাপারে আমরা সুধীর চন্দের নির্দেশ মেনে নেব, এ গানটিকে  অন্তত মতান্তরে "ভৈরব" রাগ বলা যাবে কি?  
     --পুষ্পেন্দুসুন্দর মুখোপাধ্যায়, ইমেল, মার্চ ২০১৬  


আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের ক্ষেত্রেও কিরকম পরকে আপন করে নিতে পেরেছেন -- চলিত কথায় যাকে আমরা তাঁর গান ভাঙা বলি -- তার পরিধি কত বিস্তৃত, এবং তাতেও কিরকম অপরূপ কারিগরি দেখিয়েছেন, তার একটি স-দৃষ্টান্ত আলোচনা করি।

গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে-- এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা।

আদিব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতগুলির কথার সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু সুরের দিক থেকে আলোচনা করলেও আমাদের হিন্দুসংগীতের একটি বিপুল রত্নভাণ্ডারের পরিচয় ও ইতিহাস পাওয়া যাবে। আজ যে ভাঙা গানের আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তারও অধিকাংশ এই ভাণ্ডারেই সঞ্চিত। কবি নিজে যেখানে ভালো সুরটি শুনেছেন, অথবা অন্য লোকে দেশ-বিদেশ থেকে যে-সব গান আহরণ করে তাঁকে এনে দিয়েছেন, তার প্রায় সবগুলিই তিনি পূজার বেদীতে নিবেদন করেছেন, এ বললে অত্যুক্তি হয় না। মাঘোৎসবে নতুন নতুন গান সরবরাহের তাগিদ তার অন্যতম কারণ হতে পারে।  
     --ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৩৯৮  


 

 

২৭৬

     স্বপন যদি ভাঙিলে রজনীপ্রভাতে
     পূর্ণ করো হিয়া মঙ্গলকিরণে॥
        রাখো মোরে তব কাজে,
        নবীন করো এ জীবন হে॥
খুলি মোর গৃহদ্বার   ডাকো তোমারি ভবনে হে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

I   F you have dispelled my dream
   at the dawn of the day,
  fill in the paucity of my spirit
  with your shining goodness.
Renew this worn-out life,
  and call me to your task.
Take me out of my tiny home
  that I may serve you in your great mansion.
  
     --Anon., Anthology.  



১৯০৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  মধ্যমা কন্যা রেণুকা হঠাৎ ক্ষয় রোগে অসুস্থ, তাঁকে হাজারিবাগ ও আলমোড়ায় নিয়ে গেলেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় কলকাতায় তাঁকে ফেরৎ আনা হোলো, সেখানে ১৯শে সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু। পৌষ উৎসবে মন্দিরে ভাষণ -- 'দিন ও রাত্রি'। সতীশচন্দ্র রায় শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে এলেন। আলমোড়ায় অসুস্থা কন্যার শয্যাপাশে বসে লিখলেন 'শিশু'। বঙ্গদর্শনে 'নৌকাডুবি'-র কিস্তি চলেছে। প্রকাশ: চোখের বালি, কাব্যগ্রন্থ ১ (কাব্যসঙ্কলন), কর্মফল।

বহির্বিশ্বে: ১-৩ জানুয়ারি দিল্লি দরবারে সপ্তম এডওয়ার্ডের অভিষেক উৎসব। ইলেক্‌ট্রোকার্ডিওগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার। হেনরি ফোর্ডের মোটর কারখানা চালু। কলকাতায় ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত। ২২শে অগাস্ট পুণায় টিলক আহ্বান জানালেন বিদেশী দ্রব্য বর্জনের। জাপানি শিল্পী ওকাকুরা কলকাতায় আসেন, তাঁর অঙ্কনরীতি বাংলার শিল্পীদের প্রেরণা দেয় এবং অনুশীলন সমিতির গঠনেও তিনি সহায়তা করেন। ৩রা ডিসেম্বর বড়লাট লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন কলকাতার দৈনিকে। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ম্যান অ্যাণ্ড সুপারম্যান (শ), দি ওয়ে অফ অল ফ্লেশ (বাটলার), এশিয়া ইজ ওয়ান (ওকাকুরা)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮