গীতবিতান-GITABITAN
হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে

Manuscript

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৮ আষাঢ় ১৩১৭ (১৯১০)
কবির বয়স: ৪৯
রচনাস্থান: বোলপুর
প্রকাশ: শ্রাবণ ১৩১৭ , প্রবাসী-মাতৃ-অভিষেক |
সাহিত্য;গীতাঞ্জলি ১০৬ (১৯১০) র-র ১১।
Vishva Bharati Quarterly (1929) & Hindusthan Standard Puja Annual 1944, by Indira Devi; Indian Literature, pub.Sahitya Akademi (1958)- Krishna Kripalani; Flight of Swans
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): স্বদেশ-স্বদেশ; ১৫/২৫১
রাগ / তাল: শঙ্করা / দাদরা
স্বরলিপি: সঙ্গীত গীতাঞ্জলি; ভারততীর্থ (১৩৫৪); স্বরবিতান ৪৭
স্বরলিপিকার: ভীমরাও শাস্ত্রী; ঐ; ঐ

আলোচনা

[রবীন্দ্রনাথ] "সুরের রাজ্য এক পৃথক রাজ্য, সে দূরের জগৎ অন্য স্তর। সে স্তরে আমরা সর্বদা থাকিনে। আমরা যে-জগতে ছোটোখাটো সুখদুঃখে দোদুল্যমান হয়ে রয়েছি, সুর আমাদের নিয়ে যায় সে বন্ধন থেকে মুক্ত করে ঊর্ধলোকে, অন্য জগতে। তার সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আবেষ্টন একেবারে পৃথক। আমরা অনুভব করি হৃদয়ে সেই অনির্বচনীয় স্পর্শ, কিন্তু আমরা তো সেখানকার নয়, তাই বোধহয় এই অনির্দিষ্ট বেদনা। সুর যেখানে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, মন সেখানে নিরবলম্বন হয়ে চ্যুত হবার জন্যই যেন রয়েছে। যেমন সমুদ্রের ঢেউ ছুটে এসে ক্ষণিকের জন্য তীরকে অতিক্রম করে, আবার ফিরে যায় তার বন্ধনের মধ্যে, আমাদের মনও তেমনি নিজের এবং চারপাশের বন্ধন অতিক্রম করে ভেসে যায় সুরধ্বনিতে, কিন্তু সেখানে তার স্থান নয়। আবার ফিরে আসতে হবে তাকে নিম্নভূমিতে। সৌন্দর্যের জগতে ক্ষণকালের এই প্রবেশ, তার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ মিলিয়ে নিতে তো মন পারে না-- ভালো লাগে, বেদনা মেশানো ভালো লাগা। "  (প ১৫২)  
     --মৈত্রেয়ী দেবী, মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, প্রাইমা পাবলিকেশনস্‌, কলকাতা, ১৯৪৩  



পর্শুদিন অমনি বোটের জানলার কাছে চুপ করে বসে আছি, একটা জেলেডিঙিতে একজন মাঝি গান গাইতে গাইতে চলে গেল-- খুব যে সুস্বর তা নয়-- হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহুকাল হল ছেলেবেলায় বাবামশায়ের সঙ্গে বোটে করে পদ্মায় আসছিলুম।-- একদিন রাত্তির প্রায় দুটোর সময় ঘুম ভেঙে যেতেই বোটের জানলাটা তুলে ধরে মুখ বাড়িয়ে দেখলুম নিস্তরঙ্গ নদীর উপরে ফুট্‌ফুটে জ্যোৎস্না হয়েছে, একটি ছোট্ট ডিঙিতে একজন ছোকরা একা একলা দাঁড় বেয়ে চলেছে, এমনি মিষ্টি গলায় গান ধরেছে-- গান তার পূর্বে তেমন মিষ্টি কখনো শুনি নি। হঠাৎ মনে হল আবার যদি জীবনটা ঠিক সেইদিন থেকে ফিরে পাই! আর একবার পরীক্ষা করে দেখা যায়। এবার তাকে আর তৃষিত শুষ্ক অপরিতৃপ্ত করে ফেলে রেখে দিই নে-- কবির গান গলায় নিয়ে একটি ছিপ্‌ছিপে ডিঙিতে জোয়ারের বেলায় পৃথিবীতে ভেসে পড়ি, গান গাই এবং বশ করি এবং দেখে আসি পৃথিবীতে কোথায় কী আছে; আপনাকেও একবার জানান দিই, অন্যকেও একবার জানি; জীবনে যৌবনে উচ্ছ্বসিত হয়ে বাতাসের মতো একবার হু হু করে বেড়িয়ে আসি, তার পরে ঘরে ফিরে এসে পরিপূর্ণ প্রফুল্ল বার্ধক্য কবির মতো কাটাই।
  --শিলাইদহ, মঙ্গলবার, ২০ আশ্বিন ১২৯৮;৬.১০.১৮৯১ #৩২  

মনে হয় যদি এই চরাচরব্যাপ্ত পূর্ণনীরবতা আপনাকে আর ধারণ করতে না পারে, সহসা তার অনাদি ভাষা যদি বিদীর্ণ হয়ে প্রকাশ পায়, তা হলে কী-একটা গভীর গম্ভীর শান্ত সুন্দর সকরুণ সংগীত পৃথিবী থেকে নক্ষত্রলোক পর্যন্ত বেজে ওঠে। আসলে তাই হচ্ছে। কেননা, জগতের যে কম্পন আমাদের চক্ষে এসে আঘাত করছে তাই আলোক, আর যে কম্পন কানে আঘাত করছে তাই শব্দ। আমরা একটু নিবিষ্টচিত্তে স্থির হয়ে চেষ্টা করলে জগতের সমস্ত সম্মিলিত আলোক এবং বর্ণের বৃহৎ হারমনিকে মনে মনে একটি বিপুল সংগীতে খানিকটা তর্জমা করে নিতে পারি।... আমি নিত্য নতুন করে অনুভব করি কিন্তু নিত্য নতুন করে কি প্রকাশ করতে পারি!
  --নাটোর, ২ ডিসেম্বর ১৮৯২; ১৮.৮.১২৯৯ #৭৩  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


বাংলা পড়িবার সময় অনেক পাঠক অধিকাংশ স্বরবর্ণকে দীর্ঘ করিয়া টানিয়া পড়েন। ... বাংলা শব্দের মধ্যে এই ধ্বনির অভাব-বশত বাংলায় পদ্যের অপেক্ষা গীতের প্রচলনই অধিক। কারণ, গীত সুরের সাহায্যে প্রত্যেক কথাটিকে মনের মধ্যে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট করিয়া দেয়। কথায় যে অভাব আছে সুরে তাহা পূর্ণ হয়। এবং গানে এক কথা বার-বার ফিরিয়া গাহিলে ক্ষতি হয় না। যতক্ষণ চিত্ত না জাগিয়া উঠে ততক্ষণ সঙ্গীত ছাড়ে না। এইজন্য প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে গান ছাড়া কবিতা নাই বলিলে হয়।  
     --রবীন্দ্রনাথ, বাংলা শব্দ ও ছন্দ, শ্রাবণ ১২৯৯ (২১৮)।  


 

 

১৫

হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
হেথায় দাঁড়ায়ে দু বাহু বাড়ায়ে নমি নরদেবতারে--
উদার ছন্দে, পরমানন্দে বন্দন করি তাঁরে।
ধ্যানগম্ভীর এই যে ভূধর,   নদী-জপমালা-ধৃত প্রান্তর,
হেথায় নিত্য হেরো পবিত্র ধরিত্রীরে--
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে॥

কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা
দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হল হারা।
হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন--
শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হোল লীন।
পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার,   সেথা হতে সবে আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে--
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে॥

এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান।
এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ এসো এসো খ্রিস্টান।
এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার।
এসো হে পতিত, হোক অপনীত সব অপমানভার।
মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা,   মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা
সবার-পরশে-পবিত্র-করা তীর্থনীরে--
আজি ভারতের মহামানবের সাগরতীরে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

A   WAKE my mind, gently awake
  in this holy place of pilgrimage
        on the shore of this vast sea of humanity
        that is India.
Here I stand with arms outstretched to hail man,
  man divine in his own image,
  and sing to His glory in notes glad and free.
These mountains rapt in meditation
  these plains with rivers winding like rosaries,
  behold this earth that is ever holy--
        on the shore of this vast sea of humanity
        that is India.
No one knows whence and at whose call
  came pouring endless inundations of men
  rushing madly along,
  to lose themselves in the sea.
Aryans and non-Aryans, Dravidians and Chinese,
  Scythians, Huns, Pathans and Moghuls--
  all are mixed, merged and lost in one body.
Now the door has opened to the West
  and gifts in hand they beckon and come.
They will give and take,
  meet and bring together,
  none shall be turned away
        from the shore of this vast sea
        of humanity that is India.
[These battling hordes
  who crashed into our midst
  with frenzied war-cries,
  cutting their way through deserts
  and over mountains,
  they are all, one and all,
  become a pulse of my being,
  none is far away.
In my blood throbs
  the echo of their diverse music.
O celestial music, fierce and terrible,
  let thy notes sound louder and louder,
  the walls that divide shall crumble
  and they who stand aloof
  in the arrogance of isolation
  they too shall come and crowd together--
        on the shore of this vast sea of humanity
        that is India.
In this land did once resound a hymn unceasing
  to the one, the primal source
  and wonder of creation,
  the music of many hearts mingling
  in that one harmony,
  and minds, disciplined and dedicated,
  had poured
  their diverse offerings into one sacrificial flame,
  and to their chant had awakened
  a Mind magnificent, all embracing,
  all absorbing.
Break open the door to the vision
  of the sacred flame,
  of the spirit's unceasing endeavour,
  for we must gather again with bowed heads
        on the shore of this vast sea of humanity
        that is India.
Behold the sacred fire
  with its blood-red flame of sorrow
  ours is the sorrow and in its flame
  we must burn within--
  so has Fate decreed.
Welcome pain, welcome anguish
  that makes us one again,
  freed of fear, freed of the load of shame!
This agony unbearable shall end
  in the spirit's rebirth, vast and boundless.
The night has run its course
  and the Mother awakes in her spacious abode
        on the shore of this vast sea of humanity
        that is India.]
Come ye Aryan, come non-Aryan,
  Hindu, Muslim, come,
  come ye English, come ye Christians,
  welcome everyone.
Come Brahmin, Cleanse your mind
  and clasp the hand of all,
  come ye outcaste, come ye lowly,
  fling away the load of shame!
Come, one and all, to the Mother's crowning,
  the sacred jar is yet to fill,
  and all must join that the water be consecrate
        on the shore of this vast sea of humanity
        that is India.
    -- [] in the poem "Bharat Teertha", left out in the song.
  
     --Krishna Kripalani, Anthology  



১৯১০ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  রথীন্দ্রনাথের বিবাহ। 'রাজা' রচনা। শান্তিনিকেতনের নানা উন্নতি -- মেয়েদের বোর্ডিং, শিশুদের জন্য নতুন বাড়ি, ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি। 'প্রায়শ্চিত্ত' অভিনয়, ধনঞ্জয় বৈরাগীর ভূমিকায় কবি। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ৯-১১, গোরা, গীতাঞ্জলি, রাজা।

বহির্বিশ্বে: লণ্ডনে ইণ্ডিয়া সোসাইটির প্রতিষ্ঠা, রদেন্‌স্টাইন সভাপতি, ফক্স স্ট্র্যাংওয়েজ সম্পাদক -- এই সোসাইটিই প্রথম ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশ করে। সপ্তম এডওয়ার্ডের মৃত্যু, পঞ্চম জর্জ পরবর্তী ব্রিটিশ সম্রাট। জাপানের কোরিয়া জয়। পর্তুগালে প্রজাতন্ত্র স্থাপন। চীনে দাসত্ব প্রথার বিলোপ। নাসিক মামলায় বিনায়ক সাভারকারের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। লিও টলস্টয়, ফ্লোরেন্‌স নাইটিংগেল ও রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা ডুনাণ্টের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: হাওয়ার্ড্‌স এণ্ড (ফর্স্টার), দি ভিলেজ (বুনিন)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


নিঃসন্দেহে বলা যায় গানের ক্ষেত্রে বিশ্বে অতুলনীয় রবীন্দ্রনাথ। এখানে দেশে ও বিদেশে অতীতে ও বর্তমানে কেউ তাঁর কাছে আসতে পারে না। এক হাতে এত গান, এত ভালো গান কখনো বাঁধেননি জগতের আর-কোনো কবি। এক রবীন্দ্রনাথের দাক্ষিণ্যে বাংলা ভাষা আজ পৃথিবীতে অগ্রণী। তুলনায় এত বড়ো জাঁকালো ইংরেজি সাহিত্যও কী দরিদ্র!  

... আসলে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিরাট কবিপ্রতিভা ও গীতপ্রতিভার যে-অদ্ভুত মিলন হয়েছে, এ মিলনই বোধহয় এর আগে কোনো মানুষে কখনো হয়নি। এত বড়ো কবি গান গেয়েছেন কবে, আর-কোন দিগ্বিজয়ী কবিপ্রতিভা গান বাঁধবার নেশায় ক্ষেপেছে! এ দুয়ের সম্মিলন হয়েছে, এমন আর যে ক'জনের কথা মনে করা যায়, সকলেই ছোটো কবি। গানে তাই রবীন্দ্রনাথ রাজা, এ তাঁর এমন সৃষ্টি যেখানে কোনো প্রতিযোগী নেই। কবিতায় গল্পে উপন্যাসে, নাটকে, প্রবন্ধে সমালোচনায় তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন, নানা দিক থেকে তাঁর তুল্য অনেকেই; গানে তাঁর মতো কেউ নেই। গান তাঁর সব চেয়ে বড়ো, সব চেয়ে ব্যক্তিগত ও বিশিষ্ট সৃষ্টি; সমগ্র রবীন্দ্র-রচনাবলীর মধ্যে গানগুলি সব চেয়ে রাবীন্দ্রিক।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪০৯