গীতবিতান-GITABITAN
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩১২ (১৯০৫)
কবির বয়স: ৪৪
প্রকাশ: আশ্বিন ১৩১২ , বাউল-সার্থকজনম |
গান (১৩১৫-বাউল;১৩১৬-জাতীয়)।
Poems 38
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): স্বদেশ-স্বদেশ; ২৪/২৫৭
রাগ / তাল: ভৈরবী / একতাল
স্বরলিপি: সঙ্গীত প্রকাশিকা; ভারততীর্থ (১৩৫৪); স্বরবিতান ৪৬
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী; ঐ; ঐ
পাদটিকা:
রবীন্দ্র-টপ্পা, মুক্তছন্দে গাওয়া হয়ে থাকে। মতান্তরে বাউলাঙ্গ গান [ র-ভা ]।
পাঠভেদ:
জন্মেছি এ দেশে
    [ গীবিন ] ১ম সং ১৩৩৮
ওই আলোতে নয়ন রেখে
    [সঙ্গীত প্রকাশিকা]।  

আলোচনা

১৩৪৮ সালের ২৫শে বৈশাখে গুরুদেবের জন্মোৎসব নিয়ে সমস্ত বাঙলাদেশ যখন মেতে উঠল, ... শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে গুরুদেবের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, পঁচিশে বৈশাখের দিন এখানে কী হবে। কথাবার্তায় বুঝলাম সেই জন্মদিন উপলক্ষ করে নৃত্যগীত ইত্যাদির আয়োজন হোক এই তাঁর ইচ্ছা। জন্মদিনের আগে একদিন সন্ধ্যায় প্রশ্ন করি, "উৎসবের সময় '   আবার যদি ইচ্ছা কর ' গানটি কি গাইব।" তাঁর জন্মদিনের গানের কথা তাঁকে জিজ্ঞাসা করাতে আপত্তি করে বললেন, " তুই বেছে নে, আমার জন্মদিনের গান আমি বেছে দেব কেন।" একটু পরে উপরের গানটির প্রসঙ্গে অনেক কথা বলে গেলেন। কথার ভাবে বুঝেছিলাম যে, দেশ তাঁকে সম্পূর্ণ চিনল না এই অভিমান তখনো তাঁর মনে রয়েছে। বলেছিলেন, "আমি যখন চলে যাব তখন বুঝবে দেশের জন্য কী করেছি।" খানিকক্ষণ নীরব হয়ে থেকে '   সার্থক জনম আমার ' গানটি প্রাণের আবেগে গেয়ে উঠলেন। বুঝলাম দেশ তাঁকে বুঝতে পারে নি এ অভিমান যতই থাকুক না কেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা তাঁর কোনোদিন কমতে পারে না। (২৬৭)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসংগীত, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৭  



বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের যুগে রচিত 'সার্থক জনম আমার' গানের সুরটি সম্ভবত পূর্বতন সুরগত কাঠামোর কালোপযোগী সংস্কার মাত্র। এই ধরনের সুরেই স্বর্ণকুমারী দেবীর 'এখনো এখনো প্রাণ সে নামে শিহরে কেন' গানটি রচিত (স্বরলিপি গীতিমালায় স্বরলিপি আছে)। (১৯)  
     --অরুণকুমার বসু, 'আমার আপন গান', একুশশতক, ১৪১৮  


ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

২৪

     সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।
     সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে॥
জানি নে তোর ধনরতন   আছে কি না রানীর মতন,
শুধু   জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে॥
কোন্‌ বনেতে জানি নে ফুল   গন্ধে এমন করে আকুল,
     কোন্‌ গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে।
আঁখি মেলে তোমার আলো   প্রথম আমার চোখ জুড়াল,
     ওই আলোতেই নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

38

B  LESSED am I that I am born to this land
     and that I had the luck to love her.

What care I if queenly treasure is not in
     her store but precious enough is
     for me the living wealth of her
     love.

The best gift of fragrance to my heart is
     from her own flowers and I know
     not where else shines the moon
     that can flood my being with such
     loveliness.

The first light revealed to my eyes was
     from her own sky and let the same light
     kiss them before they are
     closed for ever.
  

Poems: a collection of one hundred and thirty poems, all but fifteen of which have been translated by the Poet himself. Edited by Krishna Kripalani, Amiya Chakrabarty and others.  
     --Rabindranath Tagore, Poems, Visva-Bharati, 1942  



১৯০৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  ১৯শে জানুয়ারি ৮৮ বছর বয়সে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। বিধুশেখর ভট্টাচার্য শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হয়ে এলেন। মাসিক 'ভাণ্ডার' পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। আগরতলায় ত্রিপুরা সাহিত্য সমিতির আমন্ত্রণে গিয়ে 'দেশীয় রাজ্য' প্রবন্ধ পাঠ করলেন। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবে দেশব্যাপী বিক্ষোভে রবীন্দ্রনাথ যোগ দিলেন, 'অবস্থা ও ব্যবস্থা' প্রবন্ধে ব্রিটিশ দ্রব্য বয়কট ও অসহযোগ নীতির কথা বললেন। ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ হোলো। প্রতিবাদে শোভাযাত্রা হোলো রাখীবন্ধন উৎসব করে, 'বাংলার মাটি, বাংলার জল' গান গেয়ে। কবি নিজে এক বিরাট শোভাযাত্রার অগ্রণী হয়ে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ ও সকল বাঙালির মিলনের শপথ গ্রহণ ঘোষণা করলেন। বেশীর ভাগ স্বদেশী সঙ্গীত এই সময়ের রচনা। কিছুকাল এই আন্দোলনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থেকে কবি আন্দোলনের পথ থেকে সরে যান। ২২শে অক্টোবর ছাত্রদের রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে কুখ্যাত কার্লাইল সার্কুলার জারি করা হয়। তার প্রতিবাদে বহু ছাত্রসভায় বক্তৃতা। শেষে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ডন সোসাইটিতে আন্দোলনের পথ ছেড়ে দেবার কথা ঘোষণা। কুষ্টিয়ায় বয়ন বিদ্যালয়, পতিসরে কৃষিব্যাঙ্ক এবং নিজ জমিদারিতে নানা গঠনমূলক কাজ শুরু করলেন। প্রকাশ: আত্মশক্তি, বাউল, স্বদেশ।

বহির্বিশ্বে: ১৮ ফেব্রুয়ারি লণ্ডনে ইণ্ডিয়ান হোম রুল সোসাইটি স্থাপিত হয়। ২০শে জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেণ্ট বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব অনুমোদন করে। ১৯শে অগাস্ট লর্ড কার্জন পদত্যাগ করেন, নতুন বড়লাট লর্ড মিণ্টো। ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী হয়। ঢাকা শহরে রাজধানী করে পূর্ববাংলা ও আসাম মিলিয়ে এক নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। রাখীবন্ধন, স্বদেশী গান গেয়ে শোভাযাত্রা এবং অরন্ধন ইত্যাদি দ্বারা বাঙালী শোক প্রকাশ করে। রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের যুদ্ধে জাপানের জয়, শান্তিনিকেতনে বিজয়োৎসব। রাশিয়াতে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব। ডাবলিনে সিন্‌-ফিন পার্টির প্রতিষ্ঠা। সান-ইয়াৎ-সেন চীনের গুপ্তসমিতিগুলিকে একত্র করলেন মাঞ্চুদের বিতাড়নের জন্য।  লণ্ডনে মোটর বাস চলা আরম্ভ হোলো। আইনস্টাইন প্রকাশ করলেন বিশেষ আপেক্ষিকবাদ। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: বাঙালীর গান (দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত), ডি প্রোফাণ্ডিস (ওয়াইল্ড), রাইডার্স টু দি সী (সিন্‌জ্‌)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


শান্তিনিকেতনে অতিথি সাহিত্যিক বনফুল লিখছেন: " রাতে মশারীর থেকে তুলে এনে কবি বললেন:
    আমার গান শুনবে? আমি এখনও গাইতে পারি, তবে আস্তে আস্তে, গুনগুন করে গাই। বলত শুনিয়ে দিতে পারি এখনই--
কুণ্ঠিত হয়ে বললাম,  
    আপনার কষ্ট হবে না তো?
    না। কোন গানটা গাইব বল।
    আপনার যেটা খুশী। আমি আর কী বলব।

তিনি শোনালেন 'সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে'। মনে হয়েছিল যেন একটি তীক্ষ্ণ-কণ্ঠ ভ্রমর সুরের অদ্ভুত মায়ালোক সৃজন করে গেল। গান শেষ হতে দুজনেই চুপ করে রইলাম কিছুক্ষণ। (৬৯)  
     --পার্থ বসু, "গায়ক রবীন্দ্রনাথ", আনন্দ - ১৩৯৩-তে উদ্ধৃত  


বহু শতাব্দী আগে পাঞ্জাবের উট-পালকেরা যে গান গাইতো সেটি হল টপ্পা। টপ্পা সম্পর্কে একটি ধারণা আছে, যে এটি ওস্তাদী গান। আসলে এটি একেবারেই গ্রাম্য সংগীত। অযোধ্যার গোলাম নবি মারা যান উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে। তাঁর প্রিয়ার নাম ছিল শোরী। এই নামেই তিনি প্রচলিত করলেন শোরীর টপ্পা। রবীন্দ্রনাথ টপ্পা গানের সুর নিয়ে চর্চা করেছিলেন। বাংলাদেশেও টপ্পা ছিল-- নিধুবাবুর টপ্পা। রবীন্দ্রনাথ শোরীর টপ্পার ঢঙ পছন্দ করতেন। এ টপ্পায় বাহাদুরি দেখিয়ে রসবর্জিত দীর্ঘ তান দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে প্রকাশিত হয়েছে সুরের চিকনতা। তাই রস-সংযমী রবীন্দ্রনাথ নিধুবাবুর টপ্পা না নিয়ে শোরীর টপ্পাই নিলেন। এই সুরে বহু গান তাঁর আছে। (৩৫)  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬  


রবীন্দ্রনাথ নানান সুরে গান বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর সেই সহস্র সহস্র গানগুলির মধ্যে যদি কোনো একটি রাগের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তো সেটি হচ্ছে ভৈরবী। সুরসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভৈরবী-সিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভৈরবী রাগের অনুভূতি রেখে এক নব রাগ সৃষ্টি করলেন; রাগকর্তার নাম জড়িয়ে রাগের নাম-- যথা মিয়াকি তোড়ি, সুরদাসী মল্লার-- দেবার প্রথা অনুসরণ করে তার নাম দিয়েছি "রাবীন্দ্রী-ভৈরবী"। রবীন্দ্রনাথের সুরমিশ্রণ যেমন ভাবধর্মী, রাগধর্মী নয়, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীও তেমনি ভাব প্রকাশের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছে।

রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে আশাবরী, ধানশ্রী ও টোড়ি -- এই তিনটি রাগের আসা যাওয়া কানে বাজে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ, এটি রবীন্দ্রনাথের অভিনব সৃষ্টি। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীর বিশেষত্বগুলি একটু তলিয়ে দেখতে পারলেই ধরা পড়ে যায়। প্রথমত, গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে, ভৈরবীতে এটি হয় না। আর গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে বলে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে কানাড়ার ছায়া পড়েছে, তবে সেটি কিন্তু শুদ্ধ কানাড়ার, দরবারী কানাড়ার নয়। দ্বিতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে যে 'ধা'টি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে ভৈঁরোর 'ধা'। ভৈরবীর 'ধা'র সঙ্গে তার শ্রুতির পার্থক্য আছে। উদাহরণ স্বরূপ ' হে চিরনূতন ' গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 'চিরনূতন'-এর 'চিরনূ' পর্যন্ত ভৈরোঁর 'ধা'-এ বাঁধা। তৃতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে নিরঙ্কুশ 'রে', 'গা', 'ধা' ও 'নি' পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানগুলিতে। চতুর্থত, এই স্বরব্যবস্থাকে বিকৃত পর্দার উদাহরণ বলে পার পাওয়ার উপায় নেই কেন না, বিকৃত পর্দার একটা সীমা আছে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে এই ধরনের পর্দা অনেক বেশি আছে।  এছাড়া রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে শুদ্ধ 'রে', শুদ্ধ 'গা' আর কড়ি 'মা'র ব্যবহার সহজেই ধরা পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন হাজার [?] গানের মধ্যে এই নতুন রাগে বাঁধা প্রায় তিনশো গান আছে। [এইখানে সৌম্যেন্দ্রনাথ ৫০টি গানের তালিকা দিয়েছেন; আমরা এই আলোচনা খণ্ডটি সব ভৈরবী গানেই প্রয়োগ করলাম]
  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬