গীতবিতান-GITABITAN
কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ৭ আশ্বিন ১৩০৪ (১৮৯৭)
কবির বয়স: ৩৬
রচনাস্থান: যমুনা নদীবক্ষে
প্রকাশ: বৈশাখ ১৩০৭ , কল্পনা-লজ্জিতা র-র ৭ |
কাব্যগ্রন্থ ৮ (বিবিধ)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-প্রেমবৈচিত্র্য; ১২৪/৩২০
রাগ / তাল: ভৈরবী / একতাল
স্বরলিপি: শেফালি; স্বরবিতান ৫০ (শেফালি)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
পাঠভেদ:
যামিনী না যেতে জাগালে না কেন  --[শেফালি]।  

আলোচনা

দুর্নীতি কাব্যে সংক্রামক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহার উচ্ছেদ করিতে হইবে, যাঁহারা ধর্ম ও নীতির দিকে তাঁহারা আমার সহায় হউন।

... উদাহরণ দিতে হইবে? রবীন্দ্রবাবুর প্রেমের গানগুলি নিন,' সে আসে ধীরে ', ' সে[ও]কেন চুরি করে চায় ', ' দুজনে দেখা হল ' ইত্যাদি বহুতর খ্যাত গান-- সবই ইংরাজি কোর্টশিপের গান। তাঁহার ' তুমি যেও না এখনি ' , ' কেন যামিনী না যেতে জাগালে না ' ইত্যাদি গান লম্পট বা অভিসারিকার গান। ... আশ্চর্যের বিষয় এই যে এরূপ গানে মৌলিকতাও নেই। শয়ন রচনা করা, মালা গাঁথা, দীপ জ্বালা, এ সকল ব্যাপার বৈষ্ণব কবিদিগের কবিতা হইতে অপহরণ। স্থানে স্থানে পঙ্‌ক্তিকে পঙ্‌ক্তি উক্তরূপে গৃহীত। তবে রবিবাবুর সঙ্গে বৈষ্ণব কবিদিগের এই প্রভেদ যে, রবিবাবুর কবিতায় বৈষ্ণব কবিদিগের ভক্তিটুকু নাই, লালসাটুকু বেশ আছে। (১৪১)  
     --দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কাব্যে নীতি, সাহিত্য মাসিক পত্রিকা, জ্যৈষ্ঠ ১৩১৬  



[১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ চারবার মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর ও তাঁর স্বামীর আতিথ্যগ্রহণ করে কিছু সময় কাটিয়ে যান। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরভাগে দার্জিলিং ও কালিম্পঙের মাঝামাঝি মংপু একটা ছোটো শহর, মৈত্রেয়ী দেবী "গণ্ডগ্রাম" বলে উল্লেখ করেছেন, সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যুক্তি বলে বোধ হয় না। হিমালয়ের পাদপর্বতের কোলে নাগরিক জীবনের বাইরে এক শান্ত পরিবেশ, মৈত্রেয়ী দেবীর স্বামী সেখানে ডাক্তারি করতেন। মৈত্রেয়ী দেবী সব মিলিয়ে এই চারবার প্রায় পাঁচমাসের মতো কবির সাহচর্য পেয়েছিলেন, তারই দিনলিপির ধরণে লেখা স্মৃতিচিত্রের বই "মংপুতে রবীন্দ্রনাথ"।]  

[রবীন্দ্রনাথ] "আমাদের সময়টা ছিল যেন শুচিবায়ুগ্রস্ত! সে এক রোগে পাওয়া যুগ। এই যেমন তুমি অনায়াসে সেদিন বললে ওই গানটা করতে, 'যামিনী না যেতে জাগালে না কেন', আমিও অনায়াসে গাইলুম। আমাদের সময় হতো কি? কেউ গাইতে পারত না এ গান। এ যে ঘোরতর অশ্লীলতা। তাই আমি সেদিন ভাবছিলুম কেমন ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে বদলেছে হাওয়া। ... ওরে বাবা অশ্লীল নয়? 'পাখি ডাকি বলে গেল বিভাবরী বধূ চলে জলে লইয়া গাগরি'। এ যে ঘোরতর দুর্নীতি!"  
     --মৈত্রেয়ী দেবী, মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, প্রাইমা পাবলিকেশনস্‌, কলকাতা, ১৯৪৩  


রাগসংগীতে একটি বিশেষ বাঙালি ধারার কথা বলতে হয় যা রবীন্দ্রনাথও বরাবর অনুসরণ করে গেছেন।... "কেন যামিনী না যেতে জাগালে না" গানটি পুরোপুরি ভৈরবী এবং এমন মধুর ভৈরবী খুবই কম শোনা যায়। একদা এই গানটিকে নিয়ে মর‌্যালিটিকে কেন্দ্র করে বহু বাদানুবাদ হয়েছিল, কিন্তু গায়কগায়িকাদের মহলে এর সমাদর একটুও কমে নি। বাংলায় ভৈরবীতে প্রয়োজনবোধে কোনো কোনো শুদ্ধ স্বরের প্রয়োগ হয়; এতে আপত্তি ওঠানো হত না। রবীন্দ্রনাথও এই ঔদার্যের সুযোগ নিয়ে তাঁর ভৈরবীতে বহু পর্দা লাগিয়েছেন যা অর্থোডক্স মতে এই রাগে প্রযোজ্য নয়। এখানেও তাঁর মধ্যে বাংলার ট্র্যাডিশনই কার্যকর হয়েছে । (৭)  
     --রাজ্যেশ্বর মিত্র, পুরাতন বাংলা গানের পটভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসংগীতায়ন ২, সুচিত্রা মিত্র ও সুভাষ চৌধুরী সম্পাদিত, প্যাপিরাস ১৯৯০  


ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তর্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

১২৪

কেন    যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে।
       শরমে জড়িত চরণে কেমনে চলিব পথেরি মাঝে॥
আলোকপরশে মরমে মরিয়া    হেরো গো শেফালি পড়িছে ঝরিয়া,
       কোনোমতে আছে পরান ধরিয়া    কামিনী শিথিল সাজে॥
       নিবিয়া বাঁচিল নিশার প্রদীপ উষার বাতাস লাগি,
       রজনীর শশী গগনের কোণে লুকায় শরণ মাগি।
পাখি ডাকি বলে 'গেল বিভাবরী',   বধূ চলে জলে লইয়া গাগরি।
       আমি এ আকুল কবরী আবরি   কেমনে যাইব কাজে॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯৭ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: ১১ জুন নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের অধিবেশন, সভাপতি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব সভার কাজ বাংলায় করবার জন্য। আকস্মিক ভূমিকম্পে সম্মেলন বন্ধ। 'বৈকুণ্ঠের খাতা' রচনা ও খামখেয়ালী সঙ্ঘের অনুরোধে কেদারের ভূমিকায় অভিনয়। জগদীশচন্দ্র বসুকে কবিতায় অভিনন্দন। ইউনিভার্সিটি ইন্‌স্টিটিউটে  'গান্ধারীর আবেদন' আবৃত্তি। স্বদেশী পণ্যের প্রচার ও বিক্রয়ের জন্য হ্যারিসন রোডে স্বদেশী ভাণ্ডার স্থাপন। প্রকাশ: বৈকুণ্ঠের খাতা, পঞ্চভূত।

বহির্বিশ্বে: বিবেকানন্দ দেশে ফিরে সারা ভারত ঘুরে হিন্দুধর্ম ও দর্শন সম্বন্ধে বক্তৃতা দিলেন। ১লা মে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা। দামোদর হরি চাপেকর পুণার জেলাশাসককে গুলি করে হত্যা করলেন; অনেকে বলেন এই সময় থেকেই ভারতে গুপ্ত বিপ্লবী আন্দোলনের শুরু। ২০শে অগাস্ট রোনাল্ড রস কলকাতার সুখলাল কারনানি হাসপাতালে গবেষণা করে ম্যালেরিয়া রোগের উৎপত্তি রহস্য ভেদ করলেন -- পরে নোবেল পুরস্কার পান এই জন্য। কালীপ্রসন্ন সিংহের বাড়িতে 'ভারতীয় সঙ্গীতসমাজ' স্থাপিত হোলো জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে। বালগঙ্গাধর টিলকের কারাদণ্ড। অন্যান্য বিশিষ্ট লোকেদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ টিলকের মামলার খরচ চালাতে অর্থসাহায্য করেন। গ্রীসের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে তুরস্ক  হেরে যায়।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



অবশ্য একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। এর মত ভুল কথা আর নেই। সাধারণ লোকের এরকম ধারণা হবার কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের অফুরন্ত সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। যিনি প্রায় দু'হাজার গান লিখেছেন তাঁর কিছু-কিছু গান এক ঢংয়ের হতে বাধ্য; গায়ক-গায়িকারা অনেক সময় পর-পর অনুরূপ ঢংয়ের গান করেন ব'লে শ্রোতাদের মনে এই রকম ভ্রান্ত ধারণা জন্মায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। আসলে তাঁর গানে সুরের বৈচিত্র্য যত বেশী কোনো ভারতীয় সুরকারের রচনায় আজ পর্যন্ত ততটা দেখা যায়নি; তাঁর বিভিন্ন গানগুলোর সুর বিশ্লেষণ ক'রে দেখলেই একথা স্পষ্ট হবে।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)  


রবীন্দ্রনাথ নানান সুরে গান বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর সেই সহস্র সহস্র গানগুলির মধ্যে যদি কোনো একটি রাগের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তো সেটি হচ্ছে ভৈরবী। সুরসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভৈরবী-সিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভৈরবী রাগের অনুভূতি রেখে এক নব রাগ সৃষ্টি করলেন; রাগকর্তার নাম জড়িয়ে রাগের নাম-- যথা মিয়াকি তোড়ি, সুরদাসী মল্লার-- দেবার প্রথা অনুসরণ করে তার নাম দিয়েছি "রাবীন্দ্রী-ভৈরবী"। রবীন্দ্রনাথের সুরমিশ্রণ যেমন ভাবধর্মী, রাগধর্মী নয়, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীও তেমনি ভাব প্রকাশের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছে।

রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে আশাবরী, ধানশ্রী ও টোড়ি -- এই তিনটি রাগের আসা যাওয়া কানে বাজে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ, এটি রবীন্দ্রনাথের অভিনব সৃষ্টি। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীর বিশেষত্বগুলি একটু তলিয়ে দেখতে পারলেই ধরা পড়ে যায়। প্রথমত, গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে, ভৈরবীতে এটি হয় না। আর গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে বলে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে কানাড়ার ছায়া পড়েছে, তবে সেটি কিন্তু শুদ্ধ কানাড়ার, দরবারী কানাড়ার নয়। দ্বিতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে যে 'ধা'টি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে ভৈঁরোর 'ধা'। ভৈরবীর 'ধা'র সঙ্গে তার শ্রুতির পার্থক্য আছে। উদাহরণ স্বরূপ ' হে চিরনূতন ' গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 'চিরনূতন'-এর 'চিরনূ' পর্যন্ত ভৈরোঁর 'ধা'-এ বাঁধা। তৃতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে নিরঙ্কুশ 'রে', 'গা', 'ধা' ও 'নি' পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানগুলিতে। চতুর্থত, এই স্বরব্যবস্থাকে বিকৃত পর্দার উদাহরণ বলে পার পাওয়ার উপায় নেই কেন না, বিকৃত পর্দার একটা সীমা আছে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে এই ধরনের পর্দা অনেক বেশি আছে।  এছাড়া রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে শুদ্ধ 'রে', শুদ্ধ 'গা' আর কড়ি 'মা'র ব্যবহার সহজেই ধরা পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন হাজার [?] গানের মধ্যে এই নতুন রাগে বাঁধা প্রায় তিনশো গান আছে। [এইখানে সৌম্যেন্দ্রনাথ ৫০টি গানের তালিকা দিয়েছেন; আমরা এই আলোচনা খণ্ডটি সব ভৈরবী গানেই প্রয়োগ করলাম]
  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬