গীতবিতান-GITABITAN
আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান

Portrait

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  বৈশাখ ১৩২৬ (১৯১৮)
কবির বয়স: ৫৭
প্রকাশ: -
Fugitive III
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-গান; ৫/৬
রাগ / তাল: খাম্বাজ / দাদরা
স্বরলিপি: গীতিবীথিকা; স্বরবিতান ৩৪ (গীতিবীথিকা)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
একতালেও গাওয়া হয়ে থাকে।  
পাঠভেদ:
চাইনি কোনো দান  --[গীতবীথিকা]।  

আলোচনা

সেদিন আর একটা গান বাজানো হয়েছিল, "আমি তোমায় যত"। গ্রামোফোন বন্ধ হবার পর নিজেই সম্পূর্ণটা গাইলেন। সুরকে তো ধরে রাখা যায় না; ধরে রাখা যায় না তার অপরূপ মায়া, তাই সেই সন্ধ্যার মাধুরী হারিয়ে গেল। মাসি বললে, 'সত্যিই মনে পড়বে?" উনি ঈষৎ হেসে ফিরে তাকালেন-- "তা পড়বে, সত্যিই পড়বে সামনের পাহাড়ের বুকে সবুজ বন্যা, এই উদ্ধত গাছ, দূরের পথে পাহাড়িয়াদের যাতায়াত-- সিঁড়ির টবে জিরেনিয়াম, সন্ধেবেলা আলো জ্বেলে ইঙ্গিত, সবই মনে পড়বে।" মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন-- "জানি মংপু আমার মনে থাকবে-- এই কথাটি কবি পড়বে তোমার মনে। বর্ষামুখর রাতে ফাগুন সমীরণে।" (১৪০)  
     --মৈত্রেয়ী দেবী, মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, প্রাইমা পাবলিকেশনস্‌, কলকাতা, ১৯৪৩  



যেমন পূজার, যেমন প্রেমের, রবীন্দ্র-রচনায় তেমনি কয়েকটি আছে গানের গান। 'পূজা' অংশে যে একুশটি উপশ্রেণীর কল্পনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার প্রথমটিই ছিল 'গান', 'পূজা'র প্রথম বত্রিশটি রচনাই কোনো-না-কোনোভাবে সুরের কথা বলে। এটা আমাদের মনে থাকে বটে, কিন্তু অনেকসময় আমরা লক্ষ্য করতে ভুলে যাই যে 'প্রেম' অংশেরও প্রথম গানগুলি ওই একইরকমের গান, এরও প্রথম সাতাশটি রচনায় তৈরী হয়ে উঠেছে সুরের প্রসঙ্গ, গড়ে উঠেছে "গানের রতনহার"।

এ কি আকস্মিক একেবারে যে এই দুই পর্যায়ের প্রবেশক হিসেবে কবি সাজাতে চাইলেন এই গানের গানগুলি? না কি এর মধ্য দিয়ে গানের পথে ধর্মে আর গানের পথে ভালোবাসায় পৌঁছবার এক সাধনা করেন কবি? ধর্ম যেমন মানুষকে তার অহংসীমার বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, ভালোবাসারও তো সেই কাজ। নিজেকে নিজের মধ্যে থেকে মুক্তি দিতে পারি যখন, নিজেকে মুক্ত করতে পারি পরিজন-পরিবেশের মধ্যে, অনায়াস আনন্দে বা গভীর বেদনায়, সেই মুহূর্তই ভালোবাসার মুহূর্ত। ধর্ম আর ভালোবাসা এই যে চরিতার্থতা চায়, ভেঙে দিতে চায় নিজের আবরণ, সেইখানেই তো নিয়ে যেতে চায় গান, যে গানের বিষয়ে বলা হয়েছিল 'চিরকালটাই আসে সামনে, ক্ষুদ্র কালটা যায় তুচ্ছ হয়ে'। তাই গানের গান হতে পারে এই দুই পর্যায়েরই যোগ্য প্রবেশক।

কিন্তু সে কথা যদি মেনে নেওয়া যায়, তবুও আমাদের জিজ্ঞাসা মেটে না। এই দুই পর্যায়ে যে সুর বা গানের কথা সাজানো হলো, তার মধ্যে কি কোনো ভিন্ন চরিত্রের কল্পনা আছে? কয়েকটি গান এ-পর্যায়ে, কয়েকটি ও-পর্যায়ে, এই মাত্র? না কি দু-পর্যায়ের গানেও আছে কোনো প্রচ্ছন্ন ভিন্নতা? এর একটা সহজ উত্তর হতে পারে এই যে 'পূজা'র বত্রিশটি গানের মধ্যে অন্তত কুড়িটি লেখা হয়েছিল ১৯২০ সালের আগে, আর 'প্রেমে'র সাতাশটির মধ্যে বাইশটি ওই সময়ের পরে।.. কিন্তু 'গীতবিতানে' কোনো অর্থেই গণ্য করা হয়নি কালক্রম। তাই সময়ের ক্রমিকতাই একমাত্র কথা নয়, এ-দুয়ের মধ্যে প্রভেদ থাকা সম্ভব অন্য কোনো ভাবনায়।

বহুদিন আগে অমিয় চক্রবর্তী তাঁর 'গানের গান' প্রবন্ধে বলেছিলেন যে এই গানগুলিকে সাজানো চলে তিনটি পর্যায়ে: গান-শোনা, গান-শোনানো আর গানের দেওয়া-নেওয়া। তাঁর মনে হয়েছিল 'পূজা' অংশে প্রধানত সেই সুরস্রষ্টার কথা আছে, বিশ্বলোক যাঁর রাগিণী। আর 'প্রেম' অংশের মধ্যে আছে দেওয়া-নেওয়ার সম্বন্ধ, বিরহমিলনের মধ্য দিয়ে গীতলীলা। কিন্তু তবুও একটা দ্বিধা ছিল অমিয় চক্রবর্তীর, হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে গানগুলিকে এইভাবে শনাক্ত করা সহজ নয় বড়ো, হয়তো তিনি 'পূজা', 'প্রেম' নামগুলিকেই অনেকটা প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন এই প্রভেদসূত্রের বর্ণনায়। তাই শেষ পর্যন্ত বলতে হয় তাঁকে: "কিন্তু পূজা ও প্রেমের মধ্যে তো ছেদ নেই; কবির সংকল্পিত গীতবিতানে তাই লিরিকের মালা গাঁথা হয়েছে।"

তবে কি একটু অন্যভাবে ভাববো আমরা? নিজের অস্তিত্বের মধ্যে যখন মানুষ অনুভব করতে পারে সমস্ত বিশ্বের অভিঘাত, তখন সে হয়ে ওঠে গভীরতর অন্য এক মানুষ। অভিঘাতের এই সম্পর্ককে রবীন্দ্রনাথ দেখেন সুরের উপমায়। এ অভিঘাত কখনো তীব্র, কখনো মৃদু, আনন্দের কখনো, কখনো ব্যথার। এ-গানগুলিতে সুরেরও বর্ণনা তাই কখনো আগুন হয়ে আসে, কখনো ঝরণা, হোম কখনো, কখনো মালা। কিন্তু সবসময়েই সে-সুর যোগ করছে একের সঙ্গে অন্যকে, আমির সঙ্গে এক তুমিকে। সে যোগ কখনো আমার গানে, কখনো তোমার গানে।

এই তুমির বোধ যদি আত্মস্থ এক সম্পূর্ণতার বোধ, এরই সঙ্গে যুক্ত হবার পথ যদি হয় গান, তবে সে-গানে কখনো তুমি এগিয়ে আসে আমির দিকে, কখনো তুমির দিকে আমি। 'পূজা'র মধ্যে যে গানের গান, সেখানে তুমি-আমির এই বিন্যাস প্রায় সমান সমান। সেখানে ' তোমার সুরের ধারা ঝরে ', তোমার সুর ফাগুনরাতে জাগে, তুমিই সেখানে সুরের আগুন লাগায়, তোমার বীণা বাজে, কিন্তু ওরই সঙ্গে আবার ' আমার সুরে লাগে তোমার হাসি ', ' আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মিলাতে '। বলা যায়, হয়তো এই সুর মেলানোর কাজ অনেকটা সম্পন্ন হয়ে এল 'প্রেম' পর্যায়ের গানের গানে, কেননা দু-একটি ছাড়া সেখানে সবক'টি গানের উৎসে আছি আমি। সেখানে ' তোমায় গান শোনাবো, তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো '।

অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন, "গান যেখানে ভক্তিরসে বিধৃত, কবির নিজের সংগীতও সেখানে পূজার পর্যায়ে স্থান পেয়েছে।" কিন্তু এই যে জাগিয়ে রাখার গানটির কথা বলা হলো, এর মধ্যে যদি কোনো ভক্তিরস না থাকে, এ যদি হয় প্রেমেরই গান, এ যদি নন্দিনীকে শোনাতে চায় বিশু, তবে ' আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান ' কেন হবে না স্বতন্ত্রভাবে ভক্তিরসের, তা বোঝা যায় না ভালো। এ কোনো ভক্তির কথা নয়, এ হলো ব্যক্তির কথা, এ কেবল প্রকাশ-বেদনার কথা, যে-বেদনা সম্পূর্ণের সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদকে প্রত্যক্ষ করে তোলে শুধু, যে-বেদনা এগিয়ে নিতে চায় সমস্তের সঙ্গে মিলনের দিকে। তারই এক নাম হতে পারে প্রেম, তারই এক নাম হতে পারে পূজা। এই অর্থেই গানের গানগুলি এক সহজ সেতু তৈরি করে রাখে পূজা আর প্রেমের মধ্যে, দুই জগতে বড়-রকমের ভিন্নতা থাকে না আর। (৭৪)

['এই সাইটে 'সার্চ' পাতায় 'পূজা' বা 'প্রেম' পর্যায় ও 'গান' বিষয় খোঁজ করলে এসব গানের তালিকা পাওযা যাবে।]  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  


 

 

আমি তোমায় যত       শুনিয়েছিলেম গান
তার বদলে আমি        চাই নে কোনো দান॥
ভুলবে সে গান যদি      নাহয় যেয়ো ভুলে
উঠবে যখন তারা        সন্ধ্যাসাগরকূলে,
তোমার সভায় যবে      করব অবসান
এই ক'দিনের শুধু      এই ক'টি মোর তান॥
তোমার গান যে কত     শুনিয়ে ছিলে মোরে
সেই কথাটি তুমি        ভুলবে কেমন করে?
সেই কথাটি, কবি,      পড়বে তোমার মনে
বর্ষামুখর রাতে,         ফাগুন-সমীরণে--
এইটুকু মোর শুধু        রইল অভিমান
ভুল্তে সে কি পার      ভুলিয়েছ মোর প্রাণ॥

Bust

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

I Ask no reward for the songs I sang you. I shall be content if they live through the night, until Dawn, like a shepherd-maiden, calls away the stars, in alarm at the sun.
    But there were moments when you sang your songs to me, and as my pride knows, my Poet, you will ever remember that I listened and lost my heart.
  
     --Rabindranath, "The Fugitive", MacMillan, 1921

  



১৯১৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  মে ১৩ বড়ো মেয়ে মাধুরীলতার মৃত্যু। বিশ্বভারতীর ভিত্তি স্থাপন। প্রথম দক্ষিণ ভারত যাত্রা। প্রকাশ: পলাতকা, গুরু, Gitanjali and Fruit-Gathering, Lover's Gift and Crossing, The Parrot's Training, Mashi and Other Stories, Stories from Tagore.  

বহির্বিশ্বে: ৮ই জুলাই মণ্টেগু-চেম্‌স্‌ফোর্ড কমিশনের ভারত শাসন সংস্কার রিপোর্ট প্রকাশ। ১১ নভেম্বর মিত্রশক্তি ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত। জার দ্বিতীয় নিকোলাস সপরিবারে প্রাণদণ্ডে প্রাণ হারালেন। প্রথম শ্রমিক সমিতি 'দি মাদ্রাজ ইউনিয়ন'। ব্রিটেনে কিছু মহিলা ভোটাধিকার পেলেন। জয়েসের 'ইউলিসিস' উপন্যাস অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: দি হেরেটিক অফ সোয়ানা (হাউপ্টম্যান), কালেক্‌টেড পোয়েম্‌স (ব্রুক), দি ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট (স্পেঙ্গলার), এমিনেণ্ট  ভিক্টোরিয়ান্‌স (স্ট্র্যাচি), পোয়েম্‌স (হপকিন্‌স)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮