গীতবিতান-GITABITAN
ও অকূলের কূল, ও অগতির গতি

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩১৮ (১৯১১)
কবির বয়স: ৫০
প্রকাশ: ১৯১৪ , প্রবাসী-অচলায়তন নাটক |
ধর্মসঙ্গীত; অচলায়তন র-র ১১
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বন্ধু; ৭০/৩৪
রাগ / তাল: ভৈরবী / একতাল
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৫২
স্বরলিপিকার: অনাদিকুমার দস্তিদার
পাদটিকা:
পঞ্চকের গান।  

আলোচনা

[১৯১১ সালের জুলাই মাসে] 'অচলায়তন' নাটকটি এই সময় রচিত হয়। তাহা শুনিবার জন্য সকলেই অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। জুলাই মাসের গোড়াতে রবীন্দ্রনাথ কলিকাতায় আসিলেন। শুনিলাম নাটকটি প্রশান্তচন্দ্রের [মহলানবিশ] বাড়িতেই পড়িয়া শোনানো হইবে। ...  

সেদিন রবিবার ছিল। বিকাল হইতেই আমরা কয়েকজন বারান্দায় দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করিতেছিলাম, কতক্ষণে তিনি আসিবেন। প্রশান্তচন্দ্রের বাড়ি ইহারই মধ্যে অনেকে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। ঘণ্টাখানিক পরে রবীন্দ্রনাথ আসিলেন, সঙ্গে তাঁহার জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা দেবী। ...

পাঠের ব্যবস্থা যে জায়গায় হইয়াছিল, লোক তাহার তুলনায় একটু অতিরিক্তই হইয়া গিয়াছিল। ক্রমাগতই একজনের পর একজন নূতন শ্রোতা আসিতেছেন এবং রবীন্দ্রনাথ আবার গোড়া হইতে আরম্ভ করিতেছেন। 'অচলায়তনে' অনেক গান, সবগুলি তিনি একাই গাহিয়া গেলেন, তবে গলা একটু ভার থাকায় নিচু গলায়ই গাহিলেন। (২২)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  



[১৯১৭ সালের কথায় লিখছেন] প্রথম বার অচলায়তন যেমন দেখিয়াছিলাম [১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসে], এবার ঠিক সেরকম বোধ হইল না। অদীনপুণ্য ও পঞ্চকের ভূমিকা আগের মত রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথই গ্রহণ করিয়াছিলেন। দাদাঠাকুর সাজিয়াছিেল্ন জগদানন্দ রায় মহাশয়। রবীন্দ্রনাথ আগের বার যেরকম পোষাক [একটি সাদা চাদরের নতুন কায়দায় ব্যবহার] করিয়াছিলেন, এবার আর তাহা করেন নাই, শুধু গেরুয়া রঙের আলখাল্লা পরিয়াই রঙ্গমঞ্চে আসিলেন। দর্ভকদের গান এবার তেমন জমিতেছে না দেখিয়া তিনি পিছন হইতে " ও অকূলের কূল, ও অগতির গতি ", গানটিতে যোগ দিলেন। দর্শকরা সচকিত হইয়া উঠিলেন। হঠাৎ যেন অদৃশ্য স্বর্ণবীণার ঝঙ্কারে অভিনয়ক্ষেত্র পূর্ণ হইয়া গেল। নূতন আগন্তুকরা বিস্মিতভাবে এদিকে-ওদিকে তাকাইতে লাগিলেন। অভিনয় শেষ হইল " আমাদের শান্তিনিকেতন " গানটি হইয়া। (৮৯)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  


পূজায় আমরা এমন গান পাব অনেক, যেখানে প্রশস্তি আছে কিন্তু নিবেদন নেই, যেখানে প্রণতি আছে কিন্তু উন্মোচন নেই। ' ওদের সাথে মেলাও ', ' ও অকূলের কূল ', ' যিনি সকল কাজের কাজী ', ' আমরা তারেই জানি ' ধরনের গানগুলোতে কোনো আত্ম-আবিষ্কার নেই, আছে কেবল অর্চনা। এইপূজা তাই উপরস্তরের পূজা। প্রেমের গানেও তেমনি আছে উপরস্তরের প্রেম, যখন আমরা শুনি ' সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে ' বা ' যৌবনসরসীনীরে ' বা এমন-কী ' কেটেছে একেলা বিরহের বেলা 'র মতো গানগুলিতে। কিন্তু উপরের এই আবরণ যখন ছেড়ে দেয় গান, যখন ' সীমার মাঝে অসীম তুমি ' থেকে পৌঁছোই ' আজ যেমন করে গাইছে আকাশ '-এর দিকে তখনই ওই দুই পর্যায় এক জায়গায় এসে মেলে। বলা যায়, তখন পূজা আর প্রেম এই দুই শ্রেণীর বাইরে যেন কল্পনা করে নেওয়া যায় তৃতীয় আরেকটি শ্রেণী, যাকে বলি ভালোবাসার গান। আত্ম-আবরণ মোচনের প্রবল বেদনায় মথিত হয়ে উঠে এই গানগুলি দাবি করে আমাদের সমস্ত সত্তা, আর তখন মনে হয় এর চেয়ে বড়ো মন্থন, এর চেয়ে বড়ো প্যাশান বা বাসনার তাপ আর যেন নেই আমাদের অভিজ্ঞতায়। পুরুষ আর নারী পরস্পরকে নিয়েই এই তাপ; কিন্তু কেবলই পুরুষ আর নারী নয়। আমি আর আমার ভিতরে-বাইরে ব্যাপ্ত এক না-আমি, অর্থাৎ তুমি, এ-দুয়ের মধ্যে এক নিবিড় বেদনাসম্পর্ক জাগিয়ে তোলে গানের সেতু।...  রবীন্দ্রনাথের কাছে ভালোবাসা তিন শব্দের যোগ: তুমি, আমি আর গান-- ' তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে ' কেবলই সেতু বেঁধে যায় যে-গান, প্রেমের নয় শুধু, ভালোবাসার গান।(৭৭)  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  


ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

৭০

ও অকূলের কূল, ও অগতির গতি,
ও অনাথের নাথ, ও পতিতের পতি।
ও নয়নের আলো, ও রসনার মধু,
ও রতনের হার, ও পরানের বঁধু।
ও অপরূপ রূপ, ও মনোহর কথা,
ও চরমের সুখ, ও মরমের ব্যথা॥
ও ভিখারির ধন, ও অবোলার বোল--
ও জনমের দোলা, ও মরণের কোল॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

O H shore of the shoreless and hope of the hopeless,
   God of the helpless and lord of the fallen,
   Thou art light to the eyes and honey to the tongue,
   A garland of jewels, a friend to the soul.
  
   Oh breathtaking beauty and enchanting voice,
   The treasure of beggars, the words of the mute,
   Thou art supreme joy, thou art deepest heartache,
   The cradle of life and the gentle lap of death.
  
     --Marian Chatterjee, unpublished manuscript, Feb 2016  



১৯১১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শান্তিনিকেতনে পঞ্চাশতম জন্মোৎসব। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার (এখন থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মুখপত্র) সম্পাদনার ভার গ্রহণ। 'অচলায়তন' ও 'ডাকঘর' রচনা। 'জীবনস্মৃতি'র ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ১২-১৩, ছোটগল্প (ছোটদের উপযোগী)।

বহির্বিশ্বে: ১২ই ডিসেম্বর পঞ্চম জর্জের অভিষেক এবং সেই উপলক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে 'জনগণমন" গীত। মোহনবাগান আই. এফ. এ শীল্ড জিতলো ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে। মাঞ্চু রাজবংশের পতন ও সান-ইয়াৎ-সেনের উদ্যোগে চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। হলিউডে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত। বাইশ খণ্ড বিশ্বকোষ সমাপ্ত। ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যু।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


সীতা দেবী লিখছেন: [১৯১৭ সালে শান্তিনিকেতনে 'অচলায়তন'-এর অভিনয়ে] "অদীনপুণ্য ও পঞ্চকের ভূমিকায় আগেকার মত রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথই গ্রহণ করিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গেরুয়া রঙের আলখাল্লা পরিয়াই রঙ্গমঞ্চে আসিলেন। দর্ভকদের গান এবারে তেমন জমিতেছে না দেখিয়া তিনি পিছন হইতে 'ও অকূলের কূল' গানটিতে যোগ দিলেন। দর্শকরা সচকিত হইয়া উঠিলেন। হঠাৎ যেন অদৃশ্য স্বর্ণবীণার ঝংকারে অভিনয়ক্ষেত্র পূর্ণ হইয়া গেল।" (৫৪)  
     --পার্থ বসু, "গায়ক রবীন্দ্রনাথ", আনন্দ - ১৩৯৩-তে উদ্ধৃত  


নিঃসন্দেহে বলা যায় গানের ক্ষেত্রে বিশ্বে অতুলনীয় রবীন্দ্রনাথ। এখানে দেশে ও বিদেশে অতীতে ও বর্তমানে কেউ তাঁর কাছে আসতে পারে না। এক হাতে এত গান, এত ভালো গান কখনো বাঁধেননি জগতের আর-কোনো কবি। এক রবীন্দ্রনাথের দাক্ষিণ্যে বাংলা ভাষা আজ পৃথিবীতে অগ্রণী। তুলনায় এত বড়ো জাঁকালো ইংরেজি সাহিত্যও কী দরিদ্র!  

... আসলে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিরাট কবিপ্রতিভা ও গীতপ্রতিভার যে-অদ্ভুত মিলন হয়েছে, এ মিলনই বোধহয় এর আগে কোনো মানুষে কখনো হয়নি। এত বড়ো কবি গান গেয়েছেন কবে, আর-কোন দিগ্বিজয়ী কবিপ্রতিভা গান বাঁধবার নেশায় ক্ষেপেছে! এ দুয়ের সম্মিলন হয়েছে, এমন আর যে ক'জনের কথা মনে করা যায়, সকলেই ছোটো কবি। গানে তাই রবীন্দ্রনাথ রাজা, এ তাঁর এমন সৃষ্টি যেখানে কোনো প্রতিযোগী নেই। কবিতায় গল্পে উপন্যাসে, নাটকে, প্রবন্ধে সমালোচনায় তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন, নানা দিক থেকে তাঁর তুল্য অনেকেই; গানে তাঁর মতো কেউ নেই। গান তাঁর সব চেয়ে বড়ো, সব চেয়ে ব্যক্তিগত ও বিশিষ্ট সৃষ্টি; সমগ্র রবীন্দ্র-রচনাবলীর মধ্যে গানগুলি সব চেয়ে রাবীন্দ্রিক।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪০৯  


রবীন্দ্রনাথ নানান সুরে গান বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর সেই সহস্র সহস্র গানগুলির মধ্যে যদি কোনো একটি রাগের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তো সেটি হচ্ছে ভৈরবী। সুরসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভৈরবী-সিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভৈরবী রাগের অনুভূতি রেখে এক নব রাগ সৃষ্টি করলেন; রাগকর্তার নাম জড়িয়ে রাগের নাম-- যথা মিয়াকি তোড়ি, সুরদাসী মল্লার-- দেবার প্রথা অনুসরণ করে তার নাম দিয়েছি "রাবীন্দ্রী-ভৈরবী"। রবীন্দ্রনাথের সুরমিশ্রণ যেমন ভাবধর্মী, রাগধর্মী নয়, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীও তেমনি ভাব প্রকাশের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছে।

রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে আশাবরী, ধানশ্রী ও টোড়ি -- এই তিনটি রাগের আসা যাওয়া কানে বাজে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ, এটি রবীন্দ্রনাথের অভিনব সৃষ্টি। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীর বিশেষত্বগুলি একটু তলিয়ে দেখতে পারলেই ধরা পড়ে যায়। প্রথমত, গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে, ভৈরবীতে এটি হয় না। আর গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে বলে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে কানাড়ার ছায়া পড়েছে, তবে সেটি কিন্তু শুদ্ধ কানাড়ার, দরবারী কানাড়ার নয়। দ্বিতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে যে 'ধা'টি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে ভৈঁরোর 'ধা'। ভৈরবীর 'ধা'র সঙ্গে তার শ্রুতির পার্থক্য আছে। উদাহরণ স্বরূপ ' হে চিরনূতন ' গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 'চিরনূতন'-এর 'চিরনূ' পর্যন্ত ভৈরোঁর 'ধা'-এ বাঁধা। তৃতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে নিরঙ্কুশ 'রে', 'গা', 'ধা' ও 'নি' পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানগুলিতে। চতুর্থত, এই স্বরব্যবস্থাকে বিকৃত পর্দার উদাহরণ বলে পার পাওয়ার উপায় নেই কেন না, বিকৃত পর্দার একটা সীমা আছে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে এই ধরনের পর্দা অনেক বেশি আছে।  এছাড়া রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে শুদ্ধ 'রে', শুদ্ধ 'গা' আর কড়ি 'মা'র ব্যবহার সহজেই ধরা পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন হাজার [?] গানের মধ্যে এই নতুন রাগে বাঁধা প্রায় তিনশো গান আছে। [এইখানে সৌম্যেন্দ্রনাথ ৫০টি গানের তালিকা দিয়েছেন; আমরা এই আলোচনা খণ্ডটি সব ভৈরবী গানেই প্রয়োগ করলাম]
  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬